আজকের শতাব্দী সত্যের সন্ধানে নিরন্তর
বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬, আশ্বিন ১৪৩৩
বিজ্ঞাপন
এক্সক্লুসিভ

ধারাবাহিক সংঘর্ষে বিপর্যস্ত মনিপুর,ব্যহত জনজীবন

🖊মৈনাক গুহ, ভারত
ধারাবাহিক সংঘর্ষে বিপর্যস্ত মনিপুর,ব্যহত জনজীবন

 মণিপুরে ২০২৩ সালের মৈতৈ–কুকি সংঘাতের ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকিয়ে ওঠেনি। সেই পুরনো ক্ষত, অবিশ্বাস এবং বিভাজনের মধ্যেই ২০২৬ সালে রাজ্যের পাহাড়ি এলাকায় কুকি–নাগা সম্পর্ককে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সংঘর্ষ, অপহরণ, জিম্মি করার অভিযোগ, পাল্টা প্রতিশোধ, রাস্তা অবরোধ এবং পণ্য পরিবহণে বাধার কারণে মণিপুরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কাংপোকপি, সেনাপতি এবং উখরুলসহ পাহাড়ি এলাকাগুলিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই কুকি ও নাগা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা শুরু হয় এবং মে মাসে তা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছায়।

 

এই নতুন সংঘাতকে শুধুমাত্র একটি বিচ্ছিন্ন জাতিগত সংঘর্ষ হিসেবে দেখলে মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। এর পেছনে রয়েছে বসবাসের অধিকার, জমি ও এলাকার নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাসের মতো একাধিক বিষয়। ২০২৩ সালের মৈতৈ–কুকি সংঘাতের পর মণিপুরের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালের কুকি–নাগা সংঘাত সেই বিভাজনকে আরও গভীর করেছে। একই সঙ্গে রাস্তা অবরোধ এবং পণ্য পরিবহণ বন্ধের মতো কর্মসূচি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

 

পরিস্থিতি বড় আকার ধারণ করে ১৩ মে। ওই দিন কাংপোকপি ও সেনাপতি জেলার মধ্যে একাধিক হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। একই সময়ে কাংপোকপি জেলার একটি এলাকায় তিনজন খ্রিস্টান ধর্মীয় নেতা হামলায় নিহত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, তাঁরা কুকি খ্রিস্টান নেতাদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে শান্তি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে নাগাল্যান্ডে গিয়েছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি দ্রুত আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা ব্যাপক আকার ধারণ করে।

 

১৩ মে-র ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুকি ও নাগা—উভয় পক্ষের মানুষের অপহরণ ও জিম্মি করার অভিযোগ সামনে আসে। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় ৪৮ জনের বেশি মানুষকে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী অপহরণ করে জিম্মি করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে। তাঁদের মধ্যে কুকি এবং নাগা—দুই সম্প্রদায়ের মানুষই ছিলেন। এই ঘটনা সংঘাতকে সাধারণ হামলা ও পাল্টা হামলার পর্যায় থেকে আরও গুরুতর মানবিক সংকটে পরিণত করে। বহু পরিবার তাদের স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও গভীর হয়।

 

১৩ মে-র ঘটনার পর মধ্যস্থতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতার মধ্যে ১৫ মে প্রথম বড় দফায় জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হয়। ১৪ জন কুকি এবং ১৪ জন নাগা, মোট ২৮ জন মুক্তি পান বলে অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। উভয় পক্ষই দাবি করতে থাকে যে তাদের সম্প্রদায়ের আরও মানুষ অপর পক্ষের হাতে আটক রয়েছে। ফলে জিম্মি সংকট আরও কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাস্তা অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ।

 

১৭ মে ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল নাগা অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে জাতীয় সড়ক ধরে আন্তঃজেলা অর্থনৈতিক অবরোধের ঘোষণা করে। তাদের প্রধান দাবি ছিল, নিখোঁজ নাগা জিম্মিদের নিরাপদে উদ্ধার করতে হবে। এই অবরোধের ফলে মণিপুরের পাহাড়ি এলাকার সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের পণ্য পরিবহণ ব্যাহত হতে শুরু করে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝা যায় ২০ মে-র ঘটনায়। ওই সময় ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই হাজারের বেশি ট্রাক NH-2-তে আটকে পড়েছিল। দীর্ঘ সময় আটকে থাকা ট্রাকচালকদের খাদ্য ও পানীয় জলের সংকট দেখা দেয় এবং স্থানীয় মানুষ, চালকদের সংগঠন ও নিরাপত্তা বাহিনী তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করে।

 

মণিপুরের মতো পাহাড়ি ও ভৌগোলিকভাবে তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন রাজ্যে জাতীয় সড়ক দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা শুধু পরিবহণের সমস্যা নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের জীবনে। খাদ্যশস্য, জ্বালানি, ওষুধ, নির্মাণসামগ্রী এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছতে বাধার মুখে পড়ে। সরবরাহ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বাজারদর বাড়তে থাকে। ফলে সংঘাতের বোঝা শুধু সংঘর্ষপ্রবণ এলাকার মানুষ নয়, রাজ্যের অন্যান্য এলাকার সাধারণ মানুষকেও বহন করতে হয়।

 

১ জুন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল ১৪ জন কুকি জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব স্থগিত করে এবং জানায়, আগে কুকি গোষ্ঠীর হাতে আটক ছয় নাগা নাগরিককে মুক্তি দিতে হবে। ফলে জিম্মি সংকট আরও দীর্ঘায়িত হয়। এই সময় সংঘাতের একটি বিপজ্জনক চক্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক পক্ষের অপহরণ অন্য পক্ষের পাল্টা অপহরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তার পর শুরু হয় রাস্তা অবরোধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ। এর ফলে সাধারণ নাগরিকরা সংঘাতের প্রত্যক্ষ অংশ না হয়েও সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীতে পরিণত হন।

 

১০ জুন পরিস্থিতির সবচেয়ে মর্মান্তিক মোড় আসে। পুলিশ ছয়জন নিখোঁজ নাগা পুরুষের মৃতদেহ উদ্ধার করে। তাঁদের ১৩ মে-র ঘটনায় অপহৃত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বলে সন্দেহ করা হয়। এই ঘটনার পর নাগা সমাজে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং কুকি–নাগা সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে যায়। একই সময়ে রাস্তা অবরোধও আরও শক্তিশালী হয়। ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনা সংঘাতের মানবিক ক্ষতির মাত্রাকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। অপহরণ, নিখোঁজ হওয়া এবং পরে মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বহুগুণ বেড়ে যায়।

 

জুনের পর জুলাই মাসেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ছয় নাগার মৃত্যুর পর নাগা সংগঠনগুলোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরও জোরদার হয়। কাংপোকপি, সেনাপতি এবং আশপাশের এলাকায় পণ্য পরিবহণ ব্যাহত হতে থাকে। জুলাইয়ের শুরুতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই অবরোধকে প্রায় ৪৬ দিন ধরে চলা একটি বড় সংকট হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এর ফলে রাস্তার ওপর নির্ভরশীল ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে।

 

অন্যদিকে কুকি-জো সংগঠনগুলিও পাল্টা অর্থনৈতিক অবরোধের পথে যায়। ২৭ জুলাই প্রকাশিত হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, কুকি-জো সংগঠনগুলি নাগাল্যান্ডের সঙ্গে সংযোগকারী মহাসড়কে অনির্দিষ্টকালের পাল্টা অর্থনৈতিক অবরোধ শুরু করে এবং তাদের এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অবাধ চলাচলের দাবি জানায়। এর ফলে অর্থনৈতিক অবরোধ আর কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদের একটি মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

বিজ্ঞাপন

 

আগস্টের শুরুতেও উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। নাগা হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ এবং রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকে। ১২ আগস্টের সর্বশেষ প্রতিবেদনে NH-202-কে ঘিরে অবরোধের ফলে শত শত ট্রাক আটকে থাকার কথা জানানো হয়েছে। একই প্রতিবেদনে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর অর্থ হলো, সংঘাতের প্রভাব শুধু ব্যবসায়ী, ট্রাক মালিক বা পরিবহণ সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে তা সরাসরি সাধারণ পরিবারের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

 

তবে ২০২৬ সালের কুকি–নাগা সংঘাতের সামগ্রিক আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির সরকারি চূড়ান্ত হিসাব এখনও প্রকাশিত হয়নি। তাই এই সংঘাতে কয়েক কোটি বা কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে—এমন কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ককে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে তুলে ধরা উচিত নয়। কিন্তু ক্ষতির ক্ষেত্রগুলি স্পষ্ট। দীর্ঘদিন রাস্তা বন্ধ থাকায় পরিবহণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হাজার হাজার ট্রাক আটকে থাকায় চালক ও পরিবহণ সংস্থার অতিরিক্ত খরচ হয়েছে, পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। জ্বালানি ও খাদ্য পরিবহণে বাধা তৈরি হওয়ায় বাজারদর বেড়েছে। ছোট ব্যবসায়ী, দৈনিক মজুরির শ্রমিক, পরিবহণ কর্মী এবং কৃষিপণ্যের ব্যবসায়ীরা বিশেষভাবে সমস্যায় পড়েছেন।

 

অর্থনৈতিক ক্ষতির আরেকটি বড় দিক হলো মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ। কোনো এলাকায় খাদ্য বা জ্বালানির সরবরাহ কমে গেলে শুধু দাম বাড়ে না, একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয়ও বেড়ে যায়। একটি পরিবারকে যদি একই পরিমাণ খাবার কিনতে আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হয়, তাহলে শিক্ষা, চিকিৎসা, বাড়িভাড়া বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে তাদের ব্যয় কমাতে হয়। অর্থাৎ অবরোধের অর্থনৈতিক প্রভাব ধীরে ধীরে পারিবারিক জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে।

 

সামাজিক দিক থেকেও এই সংঘাতের প্রভাব গভীর। বহু বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করা মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কোথাও যাতায়াত সীমিত হয়েছে, কোথাও মানুষ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে, আবার কোথাও পরিবারকে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবতে হয়েছে। জিম্মি ও অপহরণের ঘটনা সামাজিক আস্থাকে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একজন ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের—এই পরিচয়ই অনেক ক্ষেত্রে তার নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ালে স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যবসায়িক সম্পর্ক, প্রতিবেশীসুলভ সহযোগিতা এবং আন্তঃসম্প্রদায়িক যোগাযোগও তখন সংকুচিত হতে থাকে।

 

এই সংঘাতের প্রভাব শিশু ও তরুণদের ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পরিবেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত যাতায়াত ব্যাহত হতে পারে, পরিবারগুলির আয় কমে গেলে শিক্ষার খরচ চালানো কঠিন হতে পারে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের ভয় ও অস্থিরতা একটি প্রজন্মের সামাজিক ও মানসিক বিকাশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। সংঘাত শেষ হয়ে গেলেও সেই ভয় ও অবিশ্বাস সহজে দূর হয় না।

 

মানবিক ক্ষতির দিক থেকেও পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের কুকি–নাগা সংঘাতে নিহত, অপহৃত, নিখোঁজ এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের মোট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে পার্থক্য রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট মোট সংখ্যা উল্লেখ করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। তবে ১৩ মে-র পর ৪৮ জনের বেশি মানুষ অপহৃত হওয়ার অভিযোগ, ২৮ জনের মুক্তি এবং পরে ছয়জন নাগা পুরুষের মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনা সংঘাতের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।

বিজ্ঞাপন

 

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০২৩ সাল থেকে চলতে থাকা বৃহত্তর মণিপুর সংঘাতের ক্ষত। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে, ৩ মে ২০২৩ থেকে মণিপুরে অন্তত ২০০ মানুষ নিহত এবং ৬০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গ্রাম এবং ধর্মীয় স্থানও হামলা ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের কুকি–নাগা সংঘাতকে একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং বিচ্ছিন্ন সংকট হিসেবে দেখলে মণিপুরের বাস্তব পরিস্থিতির গভীরতা বোঝা সম্ভব নয়। বরং এটি ২০২৩ সাল থেকে চলা বৃহত্তর সামাজিক বিভাজনের ওপর নতুন একটি সংঘাতের স্তর যোগ করেছে।

 

মণিপুরের ২০২৬ সালের কুকি–নাগা সংঘাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, সহিংসতা এখন শুধু গুলি বা হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপহরণ, জিম্মি সংকট, প্রতিশোধমূলক সহিংসতা, অর্থনৈতিক অবরোধ, পণ্য পরিবহণ বন্ধ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। ১৩ মে-র হামলা থেকে ১৫ মে-র জিম্মি মুক্তি, ১৭ মে-র অর্থনৈতিক অবরোধ, ১ জুনের জিম্মি সংকট, ১০ জুন ছয় নাগার মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনা এবং জুলাই–আগস্টে পাল্টা অবরোধ—পুরো ঘটনাক্রম দেখিয়ে দেয় যে সংঘাতটি ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

 

সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ মানুষের। তারা সংঘাত শুরু করেনি, অবরোধও চায়নি, কিন্তু খাদ্য, জ্বালানি, কাজ, ব্যবসা, শিক্ষা এবং নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় মূল্য তাদেরই দিতে হচ্ছে। তাই মণিপুরের এই সংকটের সমাধান শুধু নিরাপত্তা অভিযান বা রাস্তা খুলে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন নিখোঁজ ও জিম্মিদের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত, অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পুনর্বাসন, অবাধ মানবিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ এবং কুকি ও নাগা—দুই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংলাপ।

 

কারণ রাস্তা প্রশাসনিক নির্দেশে খুলে দেওয়া সম্ভব, কিন্তু মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া ভয়, ক্ষোভ এবং অবিশ্বাস একদিনে দূর করা যায় না। তার জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার দীর্ঘ প্রক্রিয়া। মণিপুরে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাই শুধু বন্দুকের নীরবতা নয়, মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের পুনর্গঠনই হতে হবে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

বিজ্ঞাপন

💬 পাঠকের মতামত (০)

  • এই খবরে এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
← সব সংবাদ

আরও পড়ুন