আজকের শতাব্দী সত্যের সন্ধানে নিরন্তর
মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬, শ্রাবণ ১৪৩৩
বিজ্ঞাপন
আন্তর্জাতিক

মণিপুরে ফের অশান্তির ছায়া: সহিংসতা, জিম্মি করার অভিযোগ ও শান্তির অনিশ্চিত পথ

#news
মণিপুরে ফের অশান্তির ছায়া: সহিংসতা, জিম্মি করার অভিযোগ ও শান্তির অনিশ্চিত পথ

 

 

মণিপুরে ২০২৩ সালের মে মাসে শুরু হওয়া মৈতৈ ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এখনও পুরোপুরি থামেনি। ২০২৬ সালে রাজ্যে নির্বাচিত সরকার ফিরে আসার পর শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নতুন করে সহিংসতা, হামলা, প্রতিবাদ এবং জিম্মি করার মতো ঘটনা পরিস্থিতিকে আবারও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নাগা এলাকাতেও উত্তেজনা। ফলে মণিপুরের বর্তমান সংকটকে শুধু মৈতৈ বনাম কুকি দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না।

 

২০২৬ সালের শুরুতে মণিপুরে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি শাসনের পর ৪ ফেব্রুয়ারি যুমনাম খেমচাঁদ সিং মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। নতুন সরকার শান্তি ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়। মার্চে কুকি-জো প্রতিনিধিদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকও হয়, যা তিন বছরের মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়।

 

কিন্তু রাজনৈতিক সংলাপ শুরু হলেও মাটির পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। এপ্রিল মাসে বিষ্ণুপুর অঞ্চলে একটি বিস্ফোরণে দুই শিশু নিহত হওয়ার ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। ওই ঘটনার পর ইম্ফল পশ্চিমে প্রতিবাদ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের খবর আসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হয়।

 

এই ঘটনার পর মণিপুরের বিভিন্ন অংশে প্রতিবাদের মাত্রা বাড়ে। অনেক মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়—তিন বছর ধরে চলা সংঘাতের পরও কেন সাধারণ মানুষ নিরাপদে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না? একদিকে নিরাপত্তা বাহিনী এলাকায় মোতায়েন রয়েছে, অন্যদিকে বিভিন্ন জাতিগত ও রাজনৈতিক সংগঠন নিজেদের দাবি নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। ইম্ফলে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

 

সাম্প্রতিক সংকটের আরও গুরুতর দিক হলো জিম্মি করার অভিযোগ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের জুন ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুকি ও নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের হাতে প্রায় ২০ জন জিম্মি হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। সংস্থাটি বলেছে, পাহাড়ি জেলাগুলিতে আন্তঃসম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধির সঙ্গে এই ঘটনাগুলিও যুক্ত। একই সময়ে মণিপুরের সংঘাত মৈতৈ ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের বাইরেও নাগা জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে।

 

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করা দরকার। কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হামলা, অপহরণ বা জিম্মি করার অভিযোগ থাকলে তার দায় সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ওপর বর্তায়; পুরো কুকি বা নাগা জনগোষ্ঠীর ওপর নয়। একইভাবে মৈতৈ সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষকে কোনো মৈতৈ-সমর্থিত সশস্ত্র বা উগ্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের জন্য সামগ্রিকভাবে দায়ী করা যায় না। এই পার্থক্য না করলে মণিপুরের বাস্তব পরিস্থিতি আরও বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে।

 

২০২৬ সালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল কাংপোকপি এলাকায় হামলা। মে মাসে সন্দেহভাজন সশস্ত্র ব্যক্তিদের হামলায় তিনজন খ্রিস্টান ধর্মীয় নেতা নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। ঘটনার পর এলাকায় বন্ধ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। এই হামলা দেখিয়ে দেয় যে মণিপুরে জাতিগত ও রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুতর হয়ে উঠেছে।

 

এরই মধ্যে সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। মণিপুর পুলিশ ৪৭৭টি নতুন যান, যার মধ্যে সুরক্ষিত যানও রয়েছে, নিরাপত্তা প্রতিক্রিয়া জোরদার করার জন্য যুক্ত করেছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো দুর্গম ও সংঘাতপ্রবণ এলাকায় দ্রুত নিরাপত্তা বাহিনী পৌঁছানো এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

 

সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা। শুধু সেনা বা পুলিশ মোতায়েন করে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। কারণ মণিপুরের সমস্যার পেছনে জমি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনিক ক্ষমতা, পাহাড় ও উপত্যকার সম্পর্ক, অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ এবং দীর্ঘদিনের জাতিগত অবিশ্বাস—একাধিক বিষয় রয়েছে।

 

২০২৩ সালের সংঘাতের মূল পটভূমিতে ছিল মণিপুর হাইকোর্টের একটি নির্দেশ, যেখানে মৈতৈ সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতি বা ST মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার কথা বলা হয়েছিল। পাহাড়ি উপজাতি সংগঠনগুলি এর বিরোধিতা করে আন্দোলন শুরু করে। ৩ মে ২০২৩-এর প্রতিবাদ দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয় এবং পরে তা ব্যাপক জাতিগত সংঘাতে পরিণত হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঘরছাড়া হন এবং মৈতৈ-অধ্যুষিত উপত্যকা ও কুকি-জো অধ্যুষিত পাহাড়ি এলাকার মধ্যে কার্যত বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।

 

তিন বছর পরেও সেই বিচ্ছিন্নতার প্রভাব রয়েছে। বহু পরিবার এখনও তাদের পুরনো বাড়িতে ফিরতে পারেনি। অনেক এলাকায় রাস্তা চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতিগত বিভাজনের কারণে একই রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যোগাযোগও কঠিন হয়েছে।

 

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলির মধ্যে জাতীয় সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজ্য সরকার এখন জাতীয় সড়কগুলি পুনরায় খুলে সব সম্প্রদায়ের জন্য অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং ইম্ফল-দিমাপুর বাস পরিষেবাও পুনরায় চালু করেছে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো যোগাযোগ পুনঃস্থাপন, অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ানো এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক ফিরিয়ে আনা।

 

কিন্তু রাস্তা খুলে দেওয়া বা পরিবহন চালু করাই সমস্যার শেষ নয়। যেসব এলাকায় মানুষের মধ্যে এখনও নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে, সেখানে চলাচল স্বাভাবিক করতে স্থানীয় পর্যায়ে বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা দরকার। একই সঙ্গে নাগরিকদের অভিযোগ শোনা, নিখোঁজ বা জিম্মি ব্যক্তিদের নিরাপদে উদ্ধার, অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

 

মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি বড় সমস্যা হলো তথ্যযুদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরনো ছবি, পুরনো ভিডিও, অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা যাচাই না করা দাবি নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়েও সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কিছু অডিওকে ভুয়ো বা বিকৃত বলে দাবি করে তদন্তের কথা জানিয়েছে। ফলে কোনো ভিডিও বা পোস্ট দেখেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া বিপজ্জনক।

 

বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—মণিপুরে স্থায়ী শান্তির জন্য শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, সব সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ দরকার। মৈতৈ, কুকি-জো, নাগা এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সম্প্রদায়কে সমষ্টিগতভাবে অপরাধী বানালে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও দুর্বল হবে।

 

একই সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা—দুটিকেই পাশাপাশি রাখতে হবে। যারা হামলা, অপহরণ, জিম্মি করা, অগ্নিসংযোগ বা অন্য অপরাধে জড়িত বলে প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কিন্তু তার সঙ্গে নিরপরাধ মানুষের ওপর প্রতিশোধমূলক বা সমষ্টিগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

 

মণিপুরের অর্থনীতিও দীর্ঘ সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাজার, পরিবহন, নির্মাণকাজ, পর্যটন এবং ছোট ব্যবসার ওপর প্রভাব পড়েছে। বহু মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বা অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদেরও দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়েছে।

 

২০২৬ সালে নতুন সরকার শান্তি প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ শুরু করেছে, সেটি সফল করতে হলে রাজনৈতিক সংলাপকে আরও বিস্তৃত করতে হবে। শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা নয়, সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রবীণ, ছাত্র সংগঠন, নারী সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং ধর্মীয় নেতাদেরও আলোচনায় যুক্ত করা দরকার। কারণ দীর্ঘ সংঘাতের ফলে যে সামাজিক ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে সারানো সম্ভব নয়।

 

সবশেষে বলা যায়, মণিপুরে সাম্প্রতিক অশান্তি দেখিয়ে দিয়েছে যে তিন বছরের সংঘাতের পরও পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর। এপ্রিলের বিস্ফোরণ, পরবর্তী প্রতিবাদ, মে মাসের প্রাণঘাতী হামলা এবং জুনে জিম্মি করার অভিযোগ—সব মিলিয়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে জাতীয় সড়ক খুলে দেওয়া, পরিবহন পুনরায় চালু করা এবং রাজনৈতিক সংলাপের মতো পদক্ষেপ আশার দিকও দেখাচ্ছে।

 

মণিপুরের সামনে তাই এখন দুটি পথ—একদিকে আবারও প্রতিশোধ, বিভাজন ও সহিংসতার চক্র; অন্যদিকে সংলাপ, আইনের শাসন, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক আস্থার মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা। কোন পথটি শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে, তা নির্ভর করবে সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং মণিপুরের সব সম্প্রদায়ের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ওপর।

 

শান্তি কেবল বন্দুকের নীরবতা নয়; শান্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন মণিপুরের একজন মৈতৈ, একজন কুকি-জো, একজন নাগা কিংবা অন্য যে কোনো সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ একই রাজ্যে নিজের জীবন, বাড়ি, কাজ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপদ বোধ করবেন।

বিজ্ঞাপন

💬 পাঠকের মতামত (০)

  • এই খবরে এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
← সব সংবাদ

আরও পড়ুন