০৯:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাণীশংকৈলে নতুন পরিচয়: ‘কারাতে তহুরা’দের গ্রাম

সুজন আলী, রাণীশংকৈল,(ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:
  • প্রকাশের সময় ০৬:৪৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
  • / ১৭৬ Time View
দু’ধারে সবুজ ধানখেতের বুক চিরে চলে গেছে সরু মেঠো পথ। এই পথ দিয়েই একসময় স্কুলে যাওয়ার সময় নবম শ্রেণীর তহুরার বুকটা ঢিপ ঢিপ করত। মোড়ের মাথায় বখাটেদের জটলা, আড়চোখে তাকানো আর অস্ফুট টিপ্পনী ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল বা হরিপুরের প্রান্তিক জনপদে এটিই ছিল চেনা ছবি। কিন্তু সেই ধূসর দিন এখন অতীত। ভীরু পায়ে চলা সেই মেয়েরাই এখন রণক্লান্ত যোদ্ধার বেশে জানান দিচ্ছে— ভয় নয়, জয়ই তাদের লক্ষ্য।
ঠাকুরগাঁওয়ের সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোতে এখন ডানা মেলছে হাজারো স্বপ্ন। যার নাম দেওয়া হয়েছে— ‘কারাতে তহুরা’।
তহুরা আক্তার এখন এলাকায় আর কেবল এক কিশোরী নয়, সে এখন ‘কারাতে তহুরা’। শুধু তহুরাই নয়, টুপুর রানী, রূপা রানী কিংবা স্বপ্নীল দেবীদের চোখে এখন আর জল নেই, আছে আত্মবিশ্বাসের তীব্র ঝিলিক। তারা সবাই প্রান্তিক কৃষক পরিবারের সন্তান। দারিদ্র্যের সঙ্গে তাদের আজন্ম মিতালি, কিন্তু অন্ধকারের শক্তির কাছে মাথা নোয়াতে তারা এখন আর রাজি নয়। একসময় পারিবারিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ আর ইভটিজিং ছিল এই জনপদের অভিশাপ। সেই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি থেকে মুক্তির দিশারি হয়ে এসেছে মানব কল্যাণ পরিষদ (এমকেপি)-এর ‘হোপ’ প্রকল্প। নেটজ-বাংলাদেশের সহযোগিতায় এই উদ্যোগ আজ এক সামাজিক বিপ্লবে রূপ নিয়েছে। ২১টি গ্রামের কয়েক হাজার কিশোরী এখন আত্মরক্ষার পাঠ নিয়ে বুক ফুলিয়ে পথে বেরোচ্ছে।বুলি দ্বারা উচ্চ বিদ্যালয়ের তহুরা জানায়, “তিন মাসের প্রশিক্ষণ আমাকে আগাগোড়া বদলে দিয়েছে। আগে একা পথে চলতে কুঁকড়ে থাকতাম। এখন দুষ্ট ছেলেরা আমাদের দেখলে পথ ছেড়ে দেয়। গ্রামবাসী আমাদের ডাকে ‘সাহসী কন্যা’ বলে।” একই সুর শোনা গেল বাঁশমালি পরিবারের মেয়ে রূপা রানীর কণ্ঠেও। তার ভাষায়, কারাতে কেবল শরীর নয়, তাদের মনকেও পাথরের মতো শক্ত করেছে।
দারিদ্র্য হার মানবে অদম্য মনোবলের কাছে স্বপ্নীল দেবীর লড়াইটা আবার বহুমাত্রিক। অভাবের সংসারে বাবার সাথে মাঠে কাজ করেও সে দমে যায়নি। অবসরে মেতে ওঠে ফুটবলের নেশায়। তার চোখেমুখে আগামীর ম্যারাডোনা হওয়ার স্বপ্ন। স্বপ্নীলের সাফ কথা— “দারিদ্র্য আছে সত্য, কিন্তু আমাদের মনোবল পাহাড়ের মতো। কারাতে শিখে আমরা ভয়কে জয় করেছি, এবার অভাবকেও হারাব।”
রাণীশংকৈল ডিগ্রী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ, রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক, তাজুল ইসলাম মনে করেন, মূল বাধা কেবল অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা। তিনি বলেন, “প্রান্তিক ঘরের মেয়েরা খেলাধুলা, শিল্প ও সাহিত্যে যে অভূতপূর্ব লড়াই করছে, তা অভাবনীয়। সঠিক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এরাই একদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লাল-সবুজের পতাকা ওড়াবে।” ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানাও এই ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, এই সাহসী মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার গল্প তিনি ঊর্ধ্বতন মহলে পৌঁছে দেবেন।
একসময় যে জনপদ পরিচিত ছিল প্রান্তিকতার অন্ধকারে, আজ সেখানেই ডানা মেলছে নতুন আশার আকাশ। রাণীশংকৈল আর হরিপুরের প্রতিটি ধূলিকণা এখন সাক্ষ্য দিচ্ছে— তহুরাদের রোখা সহজ নয়। কারণ, তারা এখন কেবল শিক্ষিতই নয়, তারা স্বাবলম্বী এবং সুরক্ষিতও।

Please Share This Post in Your Social Media

রাণীশংকৈলে নতুন পরিচয়: ‘কারাতে তহুরা’দের গ্রাম

প্রকাশের সময় ০৬:৪৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
দু’ধারে সবুজ ধানখেতের বুক চিরে চলে গেছে সরু মেঠো পথ। এই পথ দিয়েই একসময় স্কুলে যাওয়ার সময় নবম শ্রেণীর তহুরার বুকটা ঢিপ ঢিপ করত। মোড়ের মাথায় বখাটেদের জটলা, আড়চোখে তাকানো আর অস্ফুট টিপ্পনী ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল বা হরিপুরের প্রান্তিক জনপদে এটিই ছিল চেনা ছবি। কিন্তু সেই ধূসর দিন এখন অতীত। ভীরু পায়ে চলা সেই মেয়েরাই এখন রণক্লান্ত যোদ্ধার বেশে জানান দিচ্ছে— ভয় নয়, জয়ই তাদের লক্ষ্য।
ঠাকুরগাঁওয়ের সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোতে এখন ডানা মেলছে হাজারো স্বপ্ন। যার নাম দেওয়া হয়েছে— ‘কারাতে তহুরা’।
তহুরা আক্তার এখন এলাকায় আর কেবল এক কিশোরী নয়, সে এখন ‘কারাতে তহুরা’। শুধু তহুরাই নয়, টুপুর রানী, রূপা রানী কিংবা স্বপ্নীল দেবীদের চোখে এখন আর জল নেই, আছে আত্মবিশ্বাসের তীব্র ঝিলিক। তারা সবাই প্রান্তিক কৃষক পরিবারের সন্তান। দারিদ্র্যের সঙ্গে তাদের আজন্ম মিতালি, কিন্তু অন্ধকারের শক্তির কাছে মাথা নোয়াতে তারা এখন আর রাজি নয়। একসময় পারিবারিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ আর ইভটিজিং ছিল এই জনপদের অভিশাপ। সেই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি থেকে মুক্তির দিশারি হয়ে এসেছে মানব কল্যাণ পরিষদ (এমকেপি)-এর ‘হোপ’ প্রকল্প। নেটজ-বাংলাদেশের সহযোগিতায় এই উদ্যোগ আজ এক সামাজিক বিপ্লবে রূপ নিয়েছে। ২১টি গ্রামের কয়েক হাজার কিশোরী এখন আত্মরক্ষার পাঠ নিয়ে বুক ফুলিয়ে পথে বেরোচ্ছে।বুলি দ্বারা উচ্চ বিদ্যালয়ের তহুরা জানায়, “তিন মাসের প্রশিক্ষণ আমাকে আগাগোড়া বদলে দিয়েছে। আগে একা পথে চলতে কুঁকড়ে থাকতাম। এখন দুষ্ট ছেলেরা আমাদের দেখলে পথ ছেড়ে দেয়। গ্রামবাসী আমাদের ডাকে ‘সাহসী কন্যা’ বলে।” একই সুর শোনা গেল বাঁশমালি পরিবারের মেয়ে রূপা রানীর কণ্ঠেও। তার ভাষায়, কারাতে কেবল শরীর নয়, তাদের মনকেও পাথরের মতো শক্ত করেছে।
দারিদ্র্য হার মানবে অদম্য মনোবলের কাছে স্বপ্নীল দেবীর লড়াইটা আবার বহুমাত্রিক। অভাবের সংসারে বাবার সাথে মাঠে কাজ করেও সে দমে যায়নি। অবসরে মেতে ওঠে ফুটবলের নেশায়। তার চোখেমুখে আগামীর ম্যারাডোনা হওয়ার স্বপ্ন। স্বপ্নীলের সাফ কথা— “দারিদ্র্য আছে সত্য, কিন্তু আমাদের মনোবল পাহাড়ের মতো। কারাতে শিখে আমরা ভয়কে জয় করেছি, এবার অভাবকেও হারাব।”
রাণীশংকৈল ডিগ্রী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ, রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক, তাজুল ইসলাম মনে করেন, মূল বাধা কেবল অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা। তিনি বলেন, “প্রান্তিক ঘরের মেয়েরা খেলাধুলা, শিল্প ও সাহিত্যে যে অভূতপূর্ব লড়াই করছে, তা অভাবনীয়। সঠিক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এরাই একদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লাল-সবুজের পতাকা ওড়াবে।” ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানাও এই ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, এই সাহসী মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার গল্প তিনি ঊর্ধ্বতন মহলে পৌঁছে দেবেন।
একসময় যে জনপদ পরিচিত ছিল প্রান্তিকতার অন্ধকারে, আজ সেখানেই ডানা মেলছে নতুন আশার আকাশ। রাণীশংকৈল আর হরিপুরের প্রতিটি ধূলিকণা এখন সাক্ষ্য দিচ্ছে— তহুরাদের রোখা সহজ নয়। কারণ, তারা এখন কেবল শিক্ষিতই নয়, তারা স্বাবলম্বী এবং সুরক্ষিতও।