দালালের খপ্পরে পড়ে বিদেশ
দেড় যুগ পর দেশে ফেরা জাহাঙ্গীর আলম: দালালের খপ্পরে নিঃস্ব জীবন
- প্রকাশের সময় ০৪:৫৭:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫
- / ৩০৬ Time View
দালালের প্রলোভনে মালয়েশিয়া পাড়ি দেওয়া, সেখানকার অবৈধতা ও জেল-হাজতের দুঃসহ জীবন—সব মিলিয়ে দেড় যুগের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়ের নাম জাহাঙ্গীর আলম। দীর্ঘ ১৮ বছর পর দেশে ফিরেছেন তিনি, কিন্তু ফিরেছেন বাকশক্তিহীন, মর্মান্তিক স্মৃতি বুকে নিয়ে এবং একদম ভিন্ন বাস্তবতায়।
নরসিংদী সদর উপজেলার চরদিঘলদী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল জিতরামপুর গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম জাহাঙ্গীর আলমের। ছোটবেলা থেকেই বিস্তীর্ণ মেঘনা নদীতে মাছ ধরাই ছিল তাঁর জীবিকা। সংসারে চার পুত্রের জন্ম, জীবনের চাকা ঘুরাতে বিদেশযাত্রার স্বপ্ন—সব মিলিয়ে একরকম বাধ্য হয়েই তিনি পঞ্চম সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে রেখে দলাল আদম ব্যাপারীর মাধ্যমে অবৈধ পথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান।
প্রথম দিকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও পরে একসময় সম্পূর্ণভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দিন, মাস, বছর পেরিয়ে যায়—একসময় পরিবার ধরে নেয় তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই। নিখোঁজ জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে পরিবারের অপেক্ষা, শোক আর অনিশ্চয়তায় কাটতে থাকে দেড় যুগ।
অকল্পনীয় মোড়—মালয়েশিয়া থেকে ফোন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে
গত ২১ অক্টোবর নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসিয়াল মোবাইলে ফোন আসে মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া হাইকমিশন থেকে। ফোন করেন কাউন্সিলর সৈয়দ শরীফুল ইসলাম। তিনি জানান—তাদের ক্যাম্পে গুরুতর অসুস্থ, বাকশক্তিহীন এক বাংলাদেশি আটক আছেন, যার কোনো বৈধ পরিচয়পত্র নেই। হাইকমিশন নিজের ফেসবুক পেইজে তাঁর ছবি দিয়ে পরিচয় জানতে চাইলেও বহু লোক দাবি করলেও কেউ প্রমাণ করতে পারেনি যে তিনি তাঁদের স্বজন।
পরিস্থিতি বদলায় যখন নরসিংদী সদরের একজন সোশ্যাল মিডিয়ায় মন্তব্য করে জানান যে ব্যক্তি তাঁর গ্রামের হতে পারেন। হাইকমিশনের অনুরোধে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যাচাই শুরু করেন। ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান, স্থানীয় সদস্য ও গণ্যমান্য লোকজনের সহায়তায় অবশেষে খুঁজে পাওয়া যায় জাহাঙ্গীর আলমের প্রকৃত পরিবারকে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে নিশ্চিত হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এরপর দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র সংগ্রহ করে হাইকমিশনে পাঠানো হয়। হাইকমিশনও মানবিক বিবেচনায় সরকারি খরচে তাঁকে দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
১৮ বছর পর দেশে ফেরা—কিন্তু সবকিছু হারিয়ে
অবশেষে গত ৭ নভেম্বর দেশে ফেরেন জাহাঙ্গীর আলম। ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছলে তাঁকে গ্রহণ করেন তাঁর স্বজনরা। দীর্ঘদিনের জেল-জুলুম ও অবর্ণনীয় নির্যাতনে তিনি এখন বাকশক্তিহীন, বাংলাও স্পষ্ট বলতে পারেন না। কেবল চেয়ে থাকেন মানুষের দিকে—আর কান্না।
এর মধ্যে তাঁর মা-বাবা মারা গেছেন বহু আগে। দীর্ঘ প্রতীক্ষায় ক্লান্ত স্ত্রীও অন্যত্র বিয়ে করে সংসার শুরু করেছেন। জীবনের এই নির্মম বাস্তবতা এখন নীরব চোখের ভাষায় বহন করছেন জাহাঙ্গীর আলম।
প্রশাসনের মানবিক সহায়তা
নরসিংদী সদর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জাহাঙ্গীর আলমকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তাও প্রদান করা হয়েছে। চেষ্টা চলছে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সম্ভাব্য সহযোগিতা নিশ্চিত করার।
এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো—দালালের খপ্পরে পড়ে অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত কীভাবে চিরজীবনের কান্না হয়ে ফিরে আসে।





















